নামাজবিমুখী স্ত্রী যখন নামাজমুখী

নামাজবিমুখী স্ত্রী যখন নামাজমুখী

 শাহেদ দ্বীন পালনে সচেতন হলেও তার স্ত্রী তাহমিনা যেনো এসবের ধারে কাছেও নেই। এ নিয়ে স্ত্রীকে অনেক বলাবলির পরও কাজ হয় না। এমনকি সে অনেকবার রাগও করেছে। কিন্তু তার স্ত্রীর কোনো পরিবর্তনই হয় না। সে বুঝতে পারলো, তার আসলে বোঝানোর পদ্ধতিতেই গলদ রয়েছে। সুন্দর করে না বললে শত ভালো বিষয়ই হোক না কেন তখন কিন্তু সে বিষয়ের আর কোনো মূল্য থাকে না, গ্রহণযোগ্যতাও থাকে না।


এতোবার বলার পরও কাজ হয় না দেখে সে চিন্তা করলো, এসব বিষয়ে রাগ না করে স্ত্রীকে বরং সুন্দর করে ভালোবাসা দিয়ে বোঝানোর দরকার। কারণ সংশোধনের মূলমন্ত্রই তো হচ্ছে ভালোবাসা। ভালোবাসা দিয়ে যেভাবে মানুষকে সংশোধন করা যায় সেটা অন্য কোনোভাবে সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে কথাগুলো গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি সহজেই মনের মধ্যে স্থান করে নিবে। তখন বলা কথাগুলো প্রতিফলন ঘটার ব্যাপারে প্রবল আশাবাদী হওয়া যাবে। তো, সেই চিন্তা থেকে একদিন সে রাতের খাবার শেষে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সুন্দর করে আদরমাখা কন্ঠে তার স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলল, এই যে তাহমিনা বেগম! তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?


– হ্যাঁ, অবশ্যই আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আজ হঠাৎ এ প্রশ্ন করছো যে?


– স্বামী হিসেবে আমি এই প্রশ্ন তোমাকে তো যেকোনো সময়ই করতে পারি-তাই না! আমার তো মনে হয় না তুমি আমাকে ভালোবাসো। কারণ তুমি আমাকে প্রকৃতরূপে ভালোবেসে থাকলে আমাকে বিপদের মুখে টেলে দিতে পারতে না।


অবাক চাহনিতে তাহমিনা বলল, কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি আবার তোমাকে বিপদের মুখে টেলে দিলাম কোথায়?


– তা তুমি নিজেই একটু চিন্তা করে দেখো না। তাহলেই তো বুঝতে পারার কথা।


– না, আমি বুঝতে পারছি না তো। তুমিই বলো। আচ্ছা! তার আগে তুমি বলো, তুমি আমাকে কতোটুকু ভালোবাসো? 


– না, তা তো মনে হয় না। তোমাকে আমি কই ভালোবাসতে পারলাম।


– কেন কেন??? তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসো না বুঝি?


– শোনো, প্রতিটি স্ত্রীই চায় তার স্বামী তাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসুক। স্বামী যেনো একদম বিশুদ্ধ মনে তার স্ত্রীকে বলে যে, হ্যাঁ আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু কেবল মুখ দিয়ে 'ভালোবাসি' উচ্চারণ করা অন্তত আমার ভালোবাসার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। বরং আমার ভালোবাসার সংজ্ঞা মতে, ভালোবাসা তাকেই বলে যে ভালোবাসা ভালোবাসার মানুষকে পথভ্রষ্ট তথা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখে। আর আমার এই সংজ্ঞা মতে, আমি তো তোমাকে ভালোবাসতে পেরেছি বলে মনে হয় না গো প্রিয়তমা।


– আমি আসলে এখনো তোমার কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারছি না। তাছাড়া, আজ হঠাৎ করে এতো মহব্বত নিয়ে কথা বলছো। এভাবে তো তোমার মুখ থেকে আগে কখনো শুনেছি বলে মনে হয় না।


– আজ থেকে না হয় তোমার সাথে এভাবে মহব্বত নিয়েই কথা বলে যাবো-কেমন?


– হুম।


– আচ্ছা, ও তাহমিনা, এই যে তুমি একের পর এক সালাত ত্যাগ করে যাচ্ছো, মাহরাম, গায়রে মাহরাম তথা পর্দার মতো ফরয বিধানকে লঙ্ঘন করে সবার সামনে একদম মুক্তভাবে চলাফেরা করছো, কোরআন চর্চা বাদ দিয়ে দিন-রাত নাটক-সিনেমা নিয়ে পড়ে আছো তাতে যে তুমি নিজেকে দিন দিন জান্নাতের অনুপযুক্ত করে তুলছো তা কি তুমি বোঝো না? আর আমি তোমার স্বামী হয়েও কি তোমাকে জাহান্নামের উপযুক্ত হওয়ার মতো কর্মকান্ড থেকে বাঁচাতে পারছি? পারছি না তো। কারণ তোমাকে বারবার বলার পরও তুমি কেবল 'করছি', 'করবো' এরূপ বলে বলে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করো।


আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা'আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে। [১]


এই আয়াতে আল্লাহ একদম স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, নিজের পাশাপাশি নিজের পরিবারকেও জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য তৎপর থাকতে হবে। এখন আমি কীভাবে জেনেশুনেও এই ভয়ঙ্কর আগুনের দিকে তোমাকে টেলে দিতে পারি! তুমি যে পথে হাঁটছো তা তো ভয়ঙ্কর এক অগ্নির পথেই হাঁটছো। স্বামী হিসেবে তোমাকে সেই ভয়াবহ পথ থেকে বাঁচানো কি আমার দায়িত্ব নয়?


তাছাড়া, মৃত্যুর পর অধীনস্থের জিম্মাদার হিসেবে তোমার জবাবদিহিতা তো আমাকেই করতে হবে। তখন আল্লাহর কাছে আমি কী জবাব দেবো? তখন কি আমি আল্লাহর সামনে তোমার জন্য অপমানিত হবো না? ফলে তুমি কি আমাকে এক প্রকার অপমানের জন্য প্রস্তত করে তুলছো না? সর্বোপরি আমাকে ভয়ানক এক বিপদের দিকে কি নিয়ে যাচ্ছো না?  


কোনো স্ত্রী সত্যিকার অর্থে তার স্বামীকে ভালোবেসে থাকলে এভাবে মহা বিপদের দিকে টেলে দিতে পারে না, পারে না এমন কোনো কাজ করতে যে কাজের দরুণ তার স্বামী শেষ বিচারের দিন অপমানিত, লাঞ্ছিত হয়। সেজন্যই বলি তুমি আমাকে প্রকৃতরূপে ভালোবেসে থাকলে এভাবে প্রতিনিয়ত আল্লাহর অবাধ্য হয়ে চলতে থেকে আল্লাহর প্রতি আমার জবাবদিহিতাকে কঠিন করে তুলতে পারতে না সর্বোপরি আমাকে কঠিন এক বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারতে না।


অপরদিকে, তুমি যদি আল্লাহর বিধান পালনের জন্য আমার বলা কথাগুলো গুরুত্বের সাথে মানতে তবে তুমি বিপথগামী হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে। অর্থাৎ তখন আমার তোমাকে জাহান্নামমুখী হওয়া থেকে বাঁচানো হতো। আর তাতে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসারও সার্থক হতো। কিন্তু তোমাকে যদি আমি জাহান্নামের রাস্তা থেকে ফিরাতেই না পারলাম তবে সেটা তো তোমার প্রতি আমার কোনো ভালোবাসা হতে পারে না। মূলত, স্ত্রীকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারাতেই একজন স্বামীর তার স্ত্রীর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার সার্থকতা পায়। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমি বলেছি যে, আমি তোমাকে কই ভালোবাসতে পারলাম।


– আমি আসলে বিষয়টি কখনো এভাবে চিন্তা করি নি। সত্যিই তুমি খুব সুন্দর বলেছো। আর তোমার কথাগুলোর যৌক্তিকতা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ নেই। তোমার বলা আজকের এই কথাগুলো কেমন জানি আমার হৃদয়কে প্রচন্ডভাবে নাঁড়া দিচ্ছে। তোমার প্রতিটি কথাতেই চিন্তার খোরাক রয়েছে। 


– মা শা আল্লাহ! তাহলে তো ভালোই। দেখো তাহমিনা, এবার তোমাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করি। তুমি যদি কাউকে সবসময় টাকা-পয়সা, খাবার-দাবার ইত্যাদি অনেক কিছুই দিয়ে সাহায্য করার পর সে যদি তোমার কোনো গুরত্বপূর্ণ কথা না শুনে কিংবা তোমাকে অবহেলা করে তবে তার প্রতি তোমার কেমন প্রতিক্রিয়া হবে? তোমার কি তখন কোনো কষ্ট হবে না?


– কষ্ট হবে না মানে, অবশ্যই হবে। বরং তার প্রতি আমার আরো রাগ হবে। কারণ একজন মানুষকে এতো কিছু দিয়ে সাহায্য করার পরও যদি আমার যৌক্তিক কোনো কথা না শুনে বা আমার কথাগুলোকে এড়িয়ে চলে তবে সে অকৃতজ্ঞ, অনেক বড়ো মাপের অকৃতজ্ঞ।


– বেশ তো, এটা যদি তুমি বুঝতে পারো তাহলে এবার তুমিই বলো, যে আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের জন্য প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে শুরু করে জীবনে চলতে যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুর ব্যবস্থা অনবরত করেই যাচ্ছেন সেই আল্লাহর হুকুম কীভাবে আমরা অমান্য করতে পারি? কীভাবে আমরা আল্লাহর অবাধ্য হয়ে চলতে পারি? তখন কি আমাদের প্রতি আল্লাহর রাগ হওয়ার কথা নয়? আল্লাহর এতো এতো নিয়ামত ভোগ করেও আল্লাহর হুকুমের অমান্য করাতে কি আল্লাহর প্রতি আমাদের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় না?


– হ্যাঁ, অবশ্যই অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় বরং চরম মাত্রার অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়।


– তবে তুমি কীভাবে আল্লাহর এতো অগণিত নিয়ামত ভোগ করেও আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য হয়ে চলতে পারছো?তোমার কি এই ভেবে অনুতাপ হওয়ার কথা নয় যে, যে আল্লাহ না চাইতেই এতো কিছু দিয়ে যাচ্ছেন সেই আল্লাহর বিধান কীভাবে আমি এতো অনায়েসে লঙ্ঘন করে চলতে পারি। এসব বিষয় কি তোমার ভাবনার জগতে একটুও নাঁড়া দেয় না? তাহমিনা, আমরা কথাগুলো কি তুমি আদৌ উপলব্ধি করতে পারছো? আমি কথাগুলো কেবল শুনে যাওয়ার জন্য বলছি না। আমি সত্যিকার অর্থে চাই যে, তুমি আল্লাহর একজন অনুগত বান্দী হিসেবে পরিণত হও। সেজন্যই আমি এসব কথা বলছি।


– হ্যাঁ, তোমার কথাগুলো আমি উপলব্ধি করতে পারছি।


– তাহলে তো ভালো। এবার তোমাকে কোরআন হাদীসের আলোকে নামাজের মতো একটি ফরয ইবাদাতের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করি। 


আল্লাহ তা'য়ালা জাহান্নামীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘কোন জিনিস (কাজ) তোমাদেরকে (সাকার) জাহান্নামে নিয়ে এলো? তারা বলবে, আমরা নামাজীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলাম না।’ [২]


আবার, আরেক সূরায় আল্লাহ তা’আলা লা’নত দিয়ে বলেছেন, ধ্বংস রয়েছে ঐ সমস্ত নামাজীদের জন্যে, যারা নিজেদের নামাজের ব্যাপারে থাকে উদাসীন।’ [৩] 


অর্থাৎ জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে নামাজ আদায় না করা তথা নামাজবিমুখী থাকা। সুতরাং এই আয়াতদ্বয় নামাজ ত্যাগকারীদের জন্য অনেক বড়ো একটি সতর্কবার্তা।


এছাড়া, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, বান্দা (আনুগত্য) ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত ত্যাগ করা। [৪]

 

রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন, তোমাদের অভিমত কী, যদি তোমাদের কারো দরজায় একটি পানির নহর থাকে যাতে সে দৈনিক পাঁচ বার গোসল করে, তার শরীরে কি কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকতে পারে? তারা (সাহাবীগণ) উত্তরে বললেন, তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে না। রাসূল (সাঃ) বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উদাহরণ এরূপই। বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তার অপরাধসমূহ মিটিয়ে দেন। [৫]


‘যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয় আল্লাহ তা’আলা তার থেকে নিজের জিম্মাদারী উঠিয়ে নেন’। [৬]


আর সে মানুষের চেয়ে বড়ো দুর্ভাগা আর কে হতে পারে যার থেকে আল্লাহ তার জিম্মাদারী উঠিয়ে নেন। পক্ষান্তরে, সে মানুষের চেয়ে বড়ো ভাগ্যবান আর কে হতে পারে যার জিম্মাদার আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই। আল্লাহর জিম্মায় থাকতে হলে তো নামাজের বিকল্প নেই। এখন তুমি কি চাইবে না আল্লাহর জিম্মায় সবসময় থাকতে?


আবার, আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, ‘(স্মরণ কর) সেই চরম সংকটময় কিয়ামত দিবসের কথা যেই দিন তাদেরকে আহবান করা হবে সেজদা করার জন্য কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত হবে, হীনতা তাদের আচ্ছন্ন করবে অথচ যখন তারা নিরাপদ ছিল, তখন তো তাদের সেজদা করার আহ্বান করা হতো (কিন্তু তারা সেজদা করেনি)।’ [৭]

 


এই আয়াত থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে পারি যে, হাশরের ময়দানে বেনামাজিরা চরমভাবে অপদস্ত হবে। অর্থাৎ যারা দুনিয়াতে যথাযথভাবে নামাজ পড়বে না, লোক দেখানো কিংবা সুনাম লাভের আশায় নামাজ পড়তো তারা সেদিন সেজদা করতে পারবে না। বরং তারা হবে চরম অপমানিত এবং লাঞ্ছিত। পক্ষান্তরে, দুনিয়াতে যারা যথাযথভাবে নামাজ আদায় করবে, পরকালে তারা আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে সেজদায় লুটিয়ে পড়বে। সেজন্যেই আমি তোমাকে বলছি যে, কোনোক্রমেই তুমি আর নামাজ ত্যাগ করো না। এটা মারাত্মক কবিরা গোনাহ এবং এর পরিণাম খুবই ভয়াবহ।


– তোমার কাছ থেকে কোরআন হাদীসের আলোকে নামাজের গুরুত্ব শোনার পর থেকে কেমন জানি নিজেকে এখন অনেক বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছে। আমি এখন বুঝতে পারছি যে, জীবনের বেশীরভাগ সময়ই আমি আল্লাহর অবাধ্য হয়ে চলেছি, চরম কৃতজ্ঞহীন আচরণ করেছি যা তোমার আগের কথাগুলোতেও উপলব্ধি করতে পেরেছি। কিন্তু এখন আমার চিন্তা হচ্ছে অন্য এক জায়গায়। এই যে, আমি এতোদিন ধরে নামাজ, পর্দা ইত্যাদি আল্লাহর আদেশ নিষেধ অমান্য করে যাচ্ছি তাতে কি আল্লাহ এখন আমাকে ক্ষমা করবেন? কারণ আমার তো পাপের পাল্লা ইতোমধ্যে অনেক ভারী হয়ে আছে।


– শোনো তাহমিনা, অনুতপ্ত হতে পারা অনেক বড়ো একটি গুণ যা তোমার মধ্যে আমি লক্ষ করছি। গোনাহের প্রতি অনুতপ্ত হতে পারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করার এক বার্তা। এছাড়া, অনুতাপ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড়ো নিয়ামত বটে। কেননা কত মানুষই তো পাপ করেও অনুতপ্ত হয় না বরং তার পাপের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দাঁড় করিয়ে নিজেকে নিষ্পাপ প্রমাণ করতে চায়। ফলে এই নিয়ামত সবার কপালে জুটে না। আর এটি যে কতো বড়ো এক নিয়ামত সেটা বিশেষ করে তারা বুঝতে পারবে যারা একটা সময় গোনাহের পর গোনাহ করে যাওয়ার পরও মনের মধ্যে কোনো অনুতাপ অনুভব করতো না কিন্তু একসময় আল্লাহর কাছ থেকে হেদায়েত পাওয়ার পর তারা অনুতাপের অনুভূতি ফিরে পেয়েছে।ফলে তখন তারা গোনাহের প্রতি অনুতপ্ত হয়ে সঠিক পথে ফিরে আসতে পেরেছে।


মনের মধ্যে অনুতাপ কাজ না করলে গোনাহ থেকে ফিরে আসা যায় না। অনুতাপই মানুষকে গোনাহ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। অনুতপ্ত হতে পারার জন্য আল্লাহর রহমতের প্রয়োজন রয়েছে। আর তোমার প্রতি আল্লাহর রহমত আছে বলেই তো তুমি আজ তোমার গোনাহের প্রতি অনুতপ্ত হতে পারেছো। আলহামদুলিল্লাহ! যাইহোক, আল্লাহ তার বান্দার গোনাহ মাফ করেন বলেই তো তিনি গাফফার, রাহমান তথা অসীম দয়ালু।


ক্ষমা নিয়ে আল্লাহ বলেছেন, “বলো-- হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর যুলুম বা অবিচার করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [৮]

 


“কিন্তু যারা তাওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নেক কাজ করে, আল্লাহ তাদের গুনাহকে নেক আমল দ্বারা পরিবর্তীত করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [৯]


 

সুতরাং হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তুমি শুধু খালিস নিয়তে তাওবা করে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকো। এখন থেকে আর আল্লাহর অবাধ্য হয়ো না। তাতেই দেখবে তুমি জান্নাতের উপযোগী হয়ে গেছো। আর আমি চাই, তোমাকে নিয়েই জান্নাতে যেতে। এটা আমার বড়ো স্বপ্ন। আর তার জন্য আমাদের উভয়কেই অবশ্যই আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে হবে।


তাই প্লিজ, আজ থেকে এমনকি আসন্ন ওয়াক্ত ফজরের ওয়াক্ত থেকে আর নামাজ ত্যাগ করো না। একইসাথে, বেপর্দায়ী হয়ে আর চলো না, আর পর পুরুষের সাথে কথা বলো না। কোনো পর নারীর সাথে আমি কথা বললে যেমন তোমার সহ্য হবে না ঠিক তেমনি কোনো পর পুরুষের সাথে তুমি কথা বললেও আমার সহ্য হবে না।তাছাড়া, মাহরাম ব্যতীত অন্য কারো সাথে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কথা বললে পর্দা লঙ্ঘিত হয় যা কবিরা গোনাহ। ফলে এ বিষয়েও আমাদের উভয়কে সচেতন হয়ে চলতে হবে। আবার, নাটক সিনেমার মতো হারাম জিনিসের দিকে আর দৃষ্টিপাত করো না। প্রয়োজনে তোমাকে নিয়ে আমি মাঝে মাঝে বাইরে ঘুরতে যাবো। তবুও বিনোদনের নামে এগুলোতে আর সময় নষ্ট করে ইবাদাত বিমুখী হয়ে থেকো না।


আমি হাত জোর করে বলছি প্লিজ, আমার কথাগুলো তুমি উপলব্ধি করার চেষ্টা করো। আমার খুব ইচ্ছে তোমাকে নিয়ে জান্নাতে যাওয়া। এখন জান্নাতে যাওয়ার কাজ না করলে কীভাবে জান্নাতে যাবো তুমিই বলো? কেউ যদি তোমার কোনো কাজ না করে দেয় তবে কি তুমি তাকে কোনো পারিশ্রমিক বা কোনো পুরষ্কার দেবে? নিশ্চয়ই দেবে না। ঠিক একইভাবে, জান্নাতে যাওয়ার জন্য শুধু আকাঙ্খা করলেই হবে না। বরং জান্নাতের মালিকের আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে থাকতে হবে। তবেই আল্লাহর দয়ায় জান্নাত নিশ্চিত হবে। আর তুমি তো খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। মা শা আল্লাহ! সুতরাং এসব বিষয় সহজেই তোমার বুঝে যাওয়ার কথা।


– বাহ্! তুমি দেখছি খুব রোমান্টিক কথা বলছো! আসলে, তুমি যেভাবে আমাকে এতোক্ষণ ধরে কোরআন হাদীসের পাশাপাশি বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছো তাতে শুধু আমি কেন, কারোরই না বোঝার কথা নয়। এভাবে বোঝানোর পরও যদি কেউ আল্লাহর দিকে ফিরে না আসে তবে আসলেই তা হবে অনেক বড়ো এক দুর্ভাগ্যের বিষয়। যাইহোক, আমি আজই আল্লাহর কাছে খালিস নিয়তে তওবা করব এবং এখন থেকে আর নামাজ মিস হবে না।


– মা শা আল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'য়ালার জন্য। তোমার এই কথায় আমার অন্তরটা যে কতোটা শীতল হয়েছে তা যদি আমি তোমাকে দেখাতে পারতাম তবে কতোই-না ভালো হতো, প্রিয়তমা। যাইহোক, তুমি বুঝতে পেরেছো তাতে আমি অনেক খুশি হয়েছি। আর আমার কথাগুলো রোমান্টিক কি-না জানি না। তবে যা যা বলেছি তা একদম মন থেকেই বলেছি। আমি জানি না কবে মালাকুল মউতের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়ে যাবে। তাই আমি চাই আমি দুনিয়াতে থাকতেই তুমি আল্লাহর একজন অনুগত বান্দীতে পরিণত হয়ে যাও। কারণ একটাই। ঐ যে বললাম, আমি সত্যিকার অর্থে তোমাকে নিয়েই জান্নাতে যেতে চাই। আর সেজন্য আমি কবরের জগতে পাড়ি দেওয়ার আগে আগেই তোমাকে জান্নাতমুখী রাস্তায় রেখে যেতে চাই, জান্নাতের উপযোগী করে তুলতে চাই।


আর বুঝলে, তাহমিনা! তোমাকে দেখলেই আমার চক্ষুদ্বয় শীতল হয়ে যায়। যতো দেখি ততোই দেখতে মন চায়। আর এমন পরম ভালোবাসার মানুষকে কোনোভাবেই আমি বিপথগামীর পথে চলতে দিতে পারি না। তাছাড়া, এমন ভালোবাসার তো কোনো মূল্যই নেই যে ভালোবাসা দিয়ে আমি তোমাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা করতে পারলাম না সর্বোপরি জাহান্নামী হওয়া থেকে বাঁচাতে পারলাম না।


অতএব, তুমি আর কক্ষণোই আল্লাহর হুকুম ভঙ্গ হয় এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয়ো না। আর তোমাকে দেখে দেখে অর্থাৎ তোমার অনুকরণ করে আমার পরবর্তী প্রজন্মরাও আল্লাহর অনুগত হয়ে চলা শিখবে এবং তারা অনুপ্রেরণা পাবে। কারণ একজন মা-ই তার সন্তানের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষক। মা যেরকম হবে তার সন্তানও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেরকম হবে। ফলে সন্তানদের সুপথগামী করার জন্য একজন মায়ের সুপথগামীতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। 


পরিশেষে তোমাকে একটি কথাই বলব, তুমি যদি আমার কথামতো আল্লাহর প্রতিটি হুকুম মেনে চলতে পারো অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানী থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারো তবে আমি তখন বুঝবো, আমি তোমাকে বিপথগামী হওয়া তথা জাহান্নামের পথে যাওয়া থেকে নিরাপদে রাখতে পারলাম। আর তোমাকে বিপথগামী হওয়া থেকে হেফাজতে রাখতে পারলেই তো আমাদের উভয়েরই ভালোবাসার পরিপূর্ণতা পাবে।


– বাহ্, কতো সুন্দর কথাগুলো। 


– তাই নাকি! এবার তোমার জন্য ছোট্ট একটি সারপ্রাইজ আছে। আমার বালিশের পাশে একটি ব্যাগ রয়েছে, ওটা একটু খুলে দেখো তো কী।


– কী এটা?


– আহহা! তুমি আগে খুলেই দেখো না।


– Wowww! এতো সুন্দর নেকলেস! হোয়াট অ্যা সাবলাইম সারপ্রাইজ ফ' মি!


– প্লিজ এখন থেকে আর 'Wow' বলো না বরং বলবে, মা শা আল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!


– ঠিক আছে, এখন থেকে আমি তাই বলবো গো।


– আমি আসলে তোমার জন্য ঐরকম দামী কিছু আনতে পারি নি।


– না, না! কী বলছো এসব। এতোক্ষণ তুমি আমাকে যে কথাগুলো শুনিয়েছো তার চেয়ে দামী জিনিস আমার জন্য আর কিছুই হতে পারে না। স্ত্রীকে জান্নাতের উপযুক্ত করার জন্য একজন স্বামীর ব্যকুলতা -স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর জন্য এর চেয়ে খাঁটি ভালোবাসা আর কি হতে পারে?


– না, আমি আসলে তেমন কিছুই করতে পারি নি। স্বামী হিসেবে আমি কেবল আমার দায়িত্বটুকু পালন করার চেষ্টা করেছি মাত্র। তুমি এখন থেকে মনোযোগ সহকারে আল্লাহর ইবাদাত করতে থাকো। আর আমিও তোমাকে যথাসম্ভব তাতে সহযোগিতা করে যাবো। ইবাদাত করার ক্ষেত্রে যখন যে মাস'য়ালার প্রয়োজন হয় তা তুমি আমাকে নির্দ্বিধায় বলবে। আমার জানা না থাকলে আমি হক্কানী আলেম উলামাদের কাছ থেকে জেনে তারপর তোমাকে এসে জানাবো। ইং শা আল্লাহ! 


– Wow! তাহলে তো আরও ভালো।


– আবারো?


– ওহ! সরি সরি, আর ভুল হবে না। মা শা আল্লাহ!


রেফারেন্সঃ


[১] সূরা আত তাহরীম, আয়াত নং : ০৬

[২] সূরা আল-মুদ্দাচ্ছির, আয়াত নং : ৪২-৪৩

[৩] সূরা মাউন, আয়াত নং : ০৪-০৫

[৪] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ৮২

[৫] সহীহ বুখারী : ৫২৮, সহীহ মুসলিম : ৬৬৭

[৬] সহীহ বুখারি : ১৮, ইবনে মাজাহ : ৪০৩৪, মুসনাদে আহমদ : ২৭৩৬৪

[৭] সূরা আল-কালাম, আয়াত নং : ৪২-৪৩

[৮] সূরা আয যুমার, আয়াত নং : ৫৩

[৯] সূরা আল ফুরকান, আয়াত নং : ৭০


লেখক : রাকিব আলী। 

How did you feel about the post?
Hope to encourage the author with your valuable feedback.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন