৮২৫ সাল। বর্তমানের স্পেন ও পর্তুগাল তখন ছিল মুসলিম উলুসের
শাসনাধীন। তখনকার ফরাসী সম্রাট লুই' তার রাজপ্রাসাদে উপবিষ্ট। একটি ক্ষুদ্র
খৃষ্টান রাজ্য ‘গুথকমার্চ' এর রাজা ব্রনহার্ট এবং কর্ডোভার এক খৃস্টান ইলুগাই
ফরাসী সম্রাটের সামনে তার কক্ষে উপবিষ্ট। রাজা লুই এর দুই সেনাপতি ও
দু'জন মন্ত্রীও তার কক্ষে উপস্থিত । সবাই পদ ও ক্ষমতায় সম্মানী ব্যক্তি, একমাত্র
ইলুগাইস সাধারণ একজন নাগরিক মাত্র।
“ইলুগাইস!” গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল সম্রাট লুই। আমাকে তােমার পরিচয়
দেয়া হয়েছিল একজন অখ্যাতি, মানহীন সাধারণ লােক হিসেবে। তােমার কথা
শুনে আমি সাক্ষাতের অনুমতি দেবাে কি-না দ্বিধান্বিত ছিলাম। কিন্তু এখন
তােমার কথা শুনে বুঝতে পেরেছি, তােমার সাথে কথা বলা আমার খুবই
দরকার ছিল। তবে আমি কিভাবে নিশ্চিত হবে যে, তুমি মুসলমানদের পক্ষে
গােয়েন্দা বৃত্তিতে লিপ্ত নও। তাছাড়া তােমার প্রতিটি কথায় রয়েছে আবেগ ও
উত্তেজনা। আবেগ প্রবণ লােকেরা কোন কাজ করতে পারে না। আমাদের কাজের
লােকের প্রয়োজন। কারণ আবেগ প্রবণ লোকেরা ত্যাগের সময় এলে হেরে যায় ।
অতিশয় আবেগের প্রশ্রয় একটা কাপুরুষতার লক্ষণ।
“আমি মুসলমানদের পক্ষে নিয়ােজিত গােয়েন্দা কি-না একথার নিশ্চয়তা
দিতে পারব না। তবে আপনার গােয়েন্দারা যদি মুসলিম গােয়েন্দাদের মত সতর্ক
ও সচেতন হয় তাহলে আমি কর্ডোভায় কি করছি সে সম্পর্কে জেনে আপনাকে
সঠিক খবর দিতে পারবে। আর আপনার দ্বিতীয় কথার জবাব তখনই দেবাে
যখন ত্যাগের সময় হবে।”
“দেখাে ইলুগাইস্! তােমাকে মুসলমানদের গােয়েন্দা হিসেবে আমি ভয় করি
। কিন্তু সম্রাট হিসেবে আমাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।”
“দেখুন! আপনার বাপ-দাদাও আপনার মতই সতর্ক ছিলেন । আপনাদের
অত্যধিক সতর্কতার জন্যেই মুসলমানদের শাসন একশ বছর অতিক্রম করেছে।
শত বছর ধরে আমরা পরাধীনতার গােলামীর জিঞ্জির বয়ে চলছি। নিজ দেশে
এখন আমরা গােলাম। আমাদের ধর্মও গােলামীর অভিশাপে পর্যুদস্ত। আপনার
মধ্যে যদি ঈসা মসীহ ও কুমারী মেরীর ভালােবাসা ও সম্মান থাকতাে; তাহলে
নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা সম্ভব হতাে না। আপনি কি
আমাকে নিষ্কর্মা আবেগী ভাবছেন? শুধু আবেগ দেখানাের জন্যে আমি এতদূর
সফর করে আপনার দরবারে হাজির হইনি।” আমি একটি পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে
আপনার কাছে এসেছি। এটি আমার ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ নয়, জাতির স্বার্থে
আমি আপনার সহযােগিতা কামনা করছি। আমার কাছে যদি আপনার মত
সেনাবাহিনী থাকত, তাহলে মুসলমানদের স্পেন থেকে তাড়িয়ে দিতে না
পারলেও আরামে যীশুর সেবকদের উপর ছুরি ঘুরাতে দিতাম না। আমি ওদেরকে
গেরিলা হামলা করে, গুপ্ত হামলা করে অস্থির করে তুলতাম।
“আমি তােমার উদ্দীপনার প্রশংসা করি ইলুগাইস! কিন্তু তুমি জানাে না
আরব মুসলমানদের সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত করা সহজ ব্যাপার নয়।” বলল ফরাসী
সম্রাট লুই।
“কেন সহজ নয় সম্রাট?” জানতে চাইল ইলুগাই।
“প্রধান বাধা হলাে, মুসলমানরা ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে।" বলল
সম্রাট লুই। তারা বিশ্বাস করে অমুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে তাদের আল্লাহু
খুশী হয়, আল্লাহ্ তাদের সহযােগী হয়। এই যুদ্ধে মরলে তারা আল্লাহর কাছে
বিরাট পুরস্কারে ভূষিত হয়।.... ইলুগাইস! তুমি যদি স্পেনে মুসলমানদের
পদার্পণ সম্পর্কে জেনে না থাক তাহলে শােন আমি তােমাকে বলছি-মুসলমানরা
যখন স্পেনের সাগর তীরে অবতরণ করে তখন এরা ছিল মাত্র সাত হাজার।
জাহাজ থেকে নেমেই এরা সবগুলাে জাহাজ পুড়িয়ে দেয় যাতে ফিরে যাওয়ার
সম্ভাবনাই আর না থাকে। মন থেকে জীবন বাঁচাবার চিন্তাই তারা সম্পূর্ণ দূর
করে দিতে জাহাজগুলাে জ্বালিয়ে দেয়।
ইলুগাইস্! তুমি একটা বিরাট বাহিনী তৈরী করতে পারবে কিন্তু
মুসলমানদের মত এ ধরনের চেতনা সৈন্যদের মধ্যে জাগাতে পারবে না যে,
তারা পশ্চাৎপসরণের চিন্তা মন থেকে সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলবে। মুসলমানদের এই
চেনতার কারণে যে দিকেই তারা অগ্রসর হয়েছে যমীন তাদের স্বাগত
জানিয়েছে। যেখানেই হামলা করেছে বিজয় তাদের পদচুম্বন করেছে, পরাজয়
তাদেরই হয়েছে যারা তাদের মােকাবেলায় অবতীর্ণ হয়েছে। একশ বছরের বেশী
হয়েছে এখনও পর্যন্ত এ অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের সীমানা বাড়িয়েই চলছে,
কখনও পিছু হটতে হয়নি তাদের। তুমি জান না, ফ্রান্সও মুসলমানদের আক্রমণ
থেকে নিরাপদ নয়। একসময় ফ্রান্সও মুসলমানরা দখল করে নিতে পারে।”
“এরপরও কি আপনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কিছুই করবেন না? আমি তাে
তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে দেয়ার চিন্তা করছি। আমি আপনাকে
বলেছি যে, এমন একটি দল আমি গঠন করেছি যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে
বিদ্রোহের জন্য খৃষ্টানদের তৈরী করছে।”
“ইলুগাইস্! আপনি কি জানেন না যে, এ পর্যন্ত কত সংখ্যক খৃস্টান
মুসলমান হয়ে গেছে। এদের মধ্যে যারা পাক্কা মুসলমান হয়ে গেছে এরা তাদের
সুলতানের বিরুদ্ধে কখনও বিদ্রোহ করতে রাজী হবে না।” বলল এক ফরাসী
মন্ত্রী।
মন্ত্রীর কথায় মুচকী হাসল ইলুগাইস। সে বলল, আমি সবই জানি। তবে
আপনাকে জানাচ্ছি, সব নওমুসলিম আমার ভক্ত। এরা মুসলমান হয়েছে ঠিকই,
রােযা নামাযও পালন করে বটে, কিন্তু মনের মধ্যে এরা এখনও যীশুখৃষ্ট ও
ক্রুশের প্রতি শ্রদ্ধাপােষণ করে। এরা আগের মতই মনে প্রাণে খৃস্টানই রয়ে
গেছে। কারণ আরব্য মুসলমানরা এসব নওমুসলিমকে হেয় মনে করে এবং
নিজেদের অভিজাত বলে বিশ্বাস করে। আরবরা নওমুসলিমদের প্রজা ভেবে
এদের সাথে ভাল ব্যবহার করে না। আমরা শাসকদের এই ত্রুটিকে কাজে
লাগিয়ে লক্ষ্য অর্জনে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি। এসব নওমুসলিম শাসকদের
সাথে একই মসজিদে নামায পড়ে, রােযা রেখে ইফতার করে, মেলামেশা ও
উঠাবসা করে কিন্তু ভিতরে ভিতরে মূলধারার শিকড় কাটতেও শুরু করেছে।
এসব নওমুসলিম স্পেনের মুসলিম শাসকদের জন্যে এক কঠিন মরীচিকা, এক
আত্মঘাতী প্রতারণা। এদের উদ্গত তৎপরতাকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্যে
আমাদের প্রয়ােজন একজন পৃষ্ঠপােষক, একজন পথপ্রদর্শক। পৃষ্ঠপােষকতা বলতে
আমি রাজনৈতিক ও সামরিক পৃষ্ঠপােষকতাকে বুঝাচ্ছি। এজন্যই আমি আপনার
দরবারে হাজির হয়েছি, সম্মানিত সম্রাট।
দীর্ঘক্ষণ কথা বলল ইলুগাই। ইলুগাইসের কথা শুনে ফরাসী সম্রাটের দৃঢ়
বিশ্বাস হলাে ইলুগাইস্ মুসলিম গােয়েন্দা নয়। সম্রাট লুই ভাবল, “দীর্ঘদিন ধরে
যে কাজটি করার কথা আমি ভাবছি সেই কাজটিই তাে করছে ইলুগাই।”
সম্রাট ইলুগাইসকে বলল, “ইলুগাই! নিজেকে এ ময়দানে একাকী মনে
করাে না। সম্মুখ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে পেরে উঠা সহজ নয়। আমার একথা
বলার অর্থ এই নয় যে, আমরা এ ব্যাপারে কিছু করছি না। এমন একটি মহান
উদ্দেশেই আমি গােথকমার্চের রাজা ব্রনহার্টকে দাওয়াত করেছি। সম্মুখ সমরে
আমরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে না জড়িয়ে ভিতরে ভিতরে এদের পায়ের তলাথেকে মাটি সরিয়ে দেবাে। এদের শিকড় স্পেনের মাটি থেকে কেটে ফেলব।
স্পেনের বর্তমান শাসক দ্বিতীয় আব্দুর রহমান কোন ধরনের মানুষ, কোন কোন
বিষয়ে সে বেশী পারদশী সবই আমি জেনেছি। তার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কেও
আমি খোঁজ খবর নিয়েছি। সে একজন লড়াকু যােদ্ধা। নিজেও যেমন যুদ্ধ করতে
পারে অপরকেও যুদ্ধে লড়াতেও জানে। ধর্মের প্রতি সে খুবই শ্রদ্ধাশীল। ”
স্পেনের সীমানা আরাে বাড়ানাের চিন্তায় বিভাের আব্দুর রহমান।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিও তার গভীর আগ্রহ রয়েছে। তার দরবার জ্ঞানী-গুণীদের
দ্বারা পরিপূর্ণ। অবশ্য তার পিতা আল-হিকাম স্পেনের অনেক ক্ষতি করেছে।
আল-হিকাম ছিল আরাম ও বিলাসপ্রিয়। তােষামােদীদের দ্বারা পরিচালিত ছিল
আল-হিকম। চাটুকারদের মােটা অঙ্কের পুরস্কারে ভূষিত করত এবং নিজেকে
জগতের সবচেয়ে বড় সম্রাট ভাৰত । কিন্তু দ্বিতীয় আব্দুর রহমান তার পিতার
ব্যতিক্রম। তার পিতা মুসলিম স্পেন ও স্পেনিশ মুসলমানদের যে ক্ষতি করেছিল
পুত্র আব্দুর রহমান সেই ঘাটতি পূরণ করতে চেষ্টা করছে।.....
বহু গুণের অধিকারী হলেও তার মধ্যে কিছু দুর্বলতাও আছে। সবচেয়ে বড়
দুর্বলতা হলাে সে সুন্দরী নারী ও নাচগানের প্রতি খুবই আসক্ত। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে
তাকে দূরে রাখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলাে তাকে নাচগান ও নারীর স্ফুর্তিতে
মাতিয়ে রাখা। তার এই দুর্বলতাকে আরাে পাকাপােক্ত করে ওকে পঙ্গু করে
দিতে হবে ইলুগাই। আবেগ ত্যাগ কর, আবেগ দিয়ে কিছু হবে না। আমি
শুনেছি, তুমি নাকি একেকটি মুসলমানকে ধরে ধরে হত্যা করতে চাও, এদেরকে
সাগরে ডুবিয়ে মারতে চাও, মুসলিম রক্তে কর্ডোভায় বন্যা হাতে চাও। আসলে
এসব যেমন কঠিন অদ্রপ নিষ্প্রয়ােজন। কারণ সম্মুখ সমরে তােমার পক্ষে
বিজয় অর্জন অসম্ভব। আমরা চাই দুশমনরা স্পেন ত্যাগ করে চলে যাক। এদের
পরাস্ত করতে হলে, দেশছাড়া করতে হলে ওদের দুর্বলতাগুলােকে চিহ্নিত করে
সেখানে আঘাত করতে হবে।”
“এদের দুর্বলতাগুলাে চিহ্নিত কিভাবে করা সম্ভব?” জিজ্ঞেস করলাে
ইলুগাই। “শাসক আব্দুর রহমানকে হত্যা করে ফেললেই তাে ল্যাঠা চুকে
যাবে।"
ইলুগাইসের একথায় মন্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে হাসল সম্রাট লুই।
এক মন্ত্রী ইলুগাইসের উদ্দেশে বলল, “বন্ধু! আপনি একজন আব্দুর
রহমানকে হত্যা করলে অপর এক আব্দুর রহমান ক্ষমতাসীন হয়ে হাজার হাজার
খৃষ্টানকে হত্যা করবে। কারণ এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে খৃষ্টানরাই জড়িত এটা
নিশ্চিত করতে তাদের মােটেও কষ্ট হবে না।
চলবে ইনশাআল্লাহ........
লেখকঃ নসীম হেজাজী
সবাই বেশি বেশি করে গল্প উপন্যাস এবং বইপ্রেমিদের এডড করুন।।
